ডায়াবেটিস এখন অত্যন্ত প্রচলিত একটি বিষয়। সব মানুষই এ বিষয়ে সাধারণ তথ্যগুলো জানেন। তার পরও এর চিকিৎসা পদ্ধতিতে নতুন নতুন বিষয় সংযোজন হচ্ছে। আমাদের এই পর্বে ডায়াবেটিসের চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেছেন স্কয়ার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন অ্যান্ড ডায়াবেটিসের পরামর্শক ডা. জাহাঙ্গীর আলম।

প্রশ্ন : একজন মানুষকে কখন আপনারা ডায়াবেটিস রোগী বলছেন?

উত্তর : ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য এখন তিনটি পরীক্ষা প্রচলিত রয়েছে। একটি হচ্ছে, খালি পেটে রক্তের শর্করা ৭ দশমিক ১-এর ওপরে যদি থাকে। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সারা রাত খালি পেটে থাকতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে, খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে, যদি সুগার ১১-এর ওপরে থাকে। আর আরেকটি হলো এইচবিএওয়ানসি, অর্থাৎ তিন মাসের গড় যদি ৬ দশমিক ৫-এর ওপরে থাকে, তাহলে আমরা রোগীকে ডায়াবেটিস বলতে পারি। তবে এই প্রতিবেদনগুলো যখন দ্বান্দ্বিক হয়, তখন আমরা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাইয়ে দুই ঘণ্টা পর পরীক্ষা করে দেখি সুগারটা কত রয়েছে। একে জিটিটি বলা হয়।

প্রশ্ন : ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, আমরা জানি এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এটি অনেক সমস্যা তৈরি করে। নিয়ন্ত্রণের জন্য আপনারা কী করেন?

উত্তর : প্রথমে জেনে নেওয়া দরকার, ডায়াবেটিস হচ্ছে সারা জীবনের রোগ। এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবে নিরাময়যোগ্য নয়। তাই প্রথমে জানতে হবে, ডায়াবেটিস আমার শরীর থেকে যাবে না। যদি ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে মাথা থেকে পা পর্যন্ত এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই, সে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। আমরা যদি মস্তিষ্কের কথা ধরি, আপনার যদি ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মস্তিষ্কের রক্তের নালিগুলো চিকন হয়ে যাবে। অনেক জটিলতা হবে।

হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। চোখের অন্ধত্ব হতে পারে। এর পর কিডনি বিকল হতে পারে। পায়ের রক্তের নালিগুলো যখন চিকন হয়ে যায়, পায়ে পচন ধরবে। সুতরাং আমরা যদি ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখি, এই জটিলতাগুলো সাধারণত হয় না। অথবা হলেও দেরিতে হয়। এবং আমরা সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারি।

প্রশ্ন : নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কী করেন?

উত্তর : নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ডায়াবেটিসের চিকিৎসা পদ্ধতিতে তিনটি জিনিসের একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। একটি হচ্ছে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ। আমরা জানি, ডায়াবেটিস হচ্ছে মূলত শর্করার জাতীয় খাদ্যের বিপাকজনিত সমস্যা। এর সঙ্গে চর্বি ও প্রোটিনেরও সমস্যা থেকে যায়। তবে মূল সমস্যা হচ্ছে কার্বোহাইড্রেটের। সুতরাং এখানে খাদ্য নিয়ন্ত্রণের একটি বিষয় রয়েছে। শরীরের ওজন অনুযায়ী খাদ্যের তালিকা দিয়ে দিই। বলে দিই, এত কিলোক্যালরি আপনার খাওয়া উচিত। তবে একটি জিনিস বলে দিই, ডায়াবেটিস হওয়া মানে এই নয় যে আপনি উপোস থাকবেন। আসলে আপনার খাওয়াটা হবে শুধু একটা মাপের খাওয়া, নিয়ন্ত্রণের মধ্যে খাওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া। তবে অভুক্ত থাকা নয়। এর মধ্যে মিষ্টিজাতীয় যে খাবারগুলো আছে, সেগুলো আপনার স্বাদের তালিকা থেকে মুছে ফেলুন। যেসব খাবার মিষ্টি, সেগুলো পরিহার করার চেষ্টা করবেন।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে, খাবারে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটগুলো পছন্দ করতে হবে। এদিকে সবজি ও মিনারেলজাতীয় খাবার যেগুলো আছে, এগুলোতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে চর্বিজাতীয় খাবারগুলো যথাসম্ভব কমিয়ে খেতে হবে। এটিও নির্ভর করে আপনার রক্তের কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য জটিলতার ওপরে।

এর পর রয়েছে ব্যায়াম। ব্যায়ামকে বলা হয় ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার লবণ। লবণ না দিলে যেমন খাবারে স্বাদ হয় না, তেমনি ব্যায়াম না করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত হয় না। এটাকে অনেকটা মহৌষধও বলতে পারেন। একজন ডায়াবেটিসের রোগীর যদি আমৃত্যু ব্যায়াম করার শক্তি থাকে, তাহলে সারা জীবন তাকে ব্যায়ামের মধ্যে থাকতে হবে।

ডায়াবেটিসের জন্য ব্যায়াম হলো দ্রুত হাঁটা। হাঁটা হতে হবে অন্তত দিনে ৩০ মিনিট। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন। প্রতি ১০ মিনিটে এক কিলোমিটার হাঁটতে হবে। প্রথম দিকে হয়তো একটু কষ্ট হবে। তবে হাঁটতে হাঁটতে দেখবেন একসময় হয়ে গেছে। হাঁটা থামাবেন না।

প্রশ্ন : হাঁটার বেলায় অনেকে জানতে চান কখন হাঁটা ভালো?

উত্তর : আপনার যদি হৃদরোগ না থাকে, কোনো জটিলতা না থাকে, তাহলে হাঁটার বিষয়টি আপনি পছন্দ অনুসারে করে নিতে পারেন জীবনযাত্রার সঙ্গে। সকালেও হাঁটতে পারেন, বিকেলেও হাঁটতে পারেন। তবে অনেকের মধ্যে দ্বিধা থাকে, সকালবেলা হাঁটলে তো স্ট্রোক হবে বা হার্ট অ্যাটাক হবে। আসলে সেটি নয়। চিকিৎসকের কাছে আপনার শরীর অনুযায়ী একটু জিজ্ঞেস করে নেবেন, কোন সময়টি আপনার হাঁটার জন্য ভালো—সকালে নাকি বিকেলে? আর যাদের কোনো জটিলতা নেই, তারা যেকোনো সময় হাঁটতে পারে, যখন সময় বের করতে পারবে। তবে সকাল বা বিকেল দুটোর একটা বেছে নেওয়াই ভালো।

এ ছাড়া ব্যায়ামের আরো কিছু বিষয় আছে। অনেকে হয়তো বাইরে বেরোতে পারেন না। অথবা তার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে একটি ট্রেডমিল মেশিন কিনে নিতে পারে। সেই যন্ত্রে ছয় অথবা সাত বেগে আপনি ৩০ মিনিট হাঁটলেন। এ ছাড়া অনেকে জিমে ভর্তি থাকেন। তাঁরা সেখানে সাঁতার কাটতে পারেন। সাইকেল চালাতে পারেন। এ কয়েকটি ব্যায়াম সাধারণত ডায়াবেটিসের জন্য অত্যন্ত ভালো। আর যেগুলো ওয়েট লিফটিং, সেগুলো হলো ফিটনেস ব্যায়াম। সেগুলো ডায়াবেটিসের এতটা উপকার করে না।

প্রশ্ন : আমরা খাওয়া-দাওয়া এবং ব্যায়াম নিয়ে জানলাম। এর পর ওষুধের বিষয়ে আপনারা কী করে থাকেন?

উত্তর : অনেকের হয়তো প্রথম দিকে দেখা যায় এই খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম দিয়ে ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনেক রকমের ওষুধ বাজারে প্রচলিত আছে। তবে যেসব ওষুধ বেশি ব্যবহার করে সালফোনাইলিউরিয়া। তবে এগুলো এখন উঠে যাচ্ছে। কেননা, এগুলোর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। মেটফরমিন অনেক পুরোনো ওষুধ। এ ছাড়া জিএলপি অ্যানালগ, ফরডিপিপি, ইনহিবিটরস এগুলো এখন আশাপ্রদ ওষুধ। নতুন কিছু ওষুধ এসছে এসজিএলটিটু ইনহিবিটরস। এগুলো আমাদের বাজারেও চলে এসেছে। এগুলো ভালো। এগুলো মুখে খাওয়ার ওষুধের সঙ্গে আমরা যোগ করতে পারি। (যেকোনো ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।)

প্রশ্ন : ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণেও নতুন কোনো পদ্ধতি আছে কী?

উত্তর : হ্যাঁ। এখন নতুন নতুন ইনসুলিন, বিভিন্ন ধরনের ইনসুলিন চলে এসেছে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি কাজ, মধ্যমমেয়াদি কাজ, স্বল্পমেয়াদি কাজের জন্য রয়েছে। ইনসুলিন দেওয়ার বিষয়েও নতুন একটি পদ্ধতি এসেছে। আপনি যদি বহু ডোজে ইনসুলিন নেন, যদি আপনার সুইয়ের ভয় থেকে যায়, আপনি যদি সহ্য করতে পারেন, তবে ইনসুলিন পাম্প চলে আসছে, সেটি ব্যবহার করতে পারেন। পাম্প লাগিয়ে সহজেই দৈনন্দিন কাজ করতে পারবেন। পাম্পে সেটআপ থাকবে, কতটুকু করে ইনসুলিন যাবে। সুতরাং এটিও একটি নতুনত্ব। এটি আমরা রোগীদের দিচ্ছি। এতে অনেক উপকার হচ্ছে। যখন যেটুকু ঘাটতি, ততটুকুই শরীরে দেবে। সমস্যা হলো যে, হাইপোগ্লাইসেমিয়া যখন হবে, তখন পাম্পটা এমনিতেই থেমে যায়।

এ ছাড়া গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতেও নতুনত্ব এসেছে। আমরা তো সাধারণত গ্লুকোমিটার দিয়ে তিন থেকে চারবার চেক করে থাকি। এখন নতুন পদ্ধতি রয়েছে নিয়মিত গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ করার জন্য। ইনসুলিন দেওয়ার আগে আমরা ধারণা করে নিই, কীভাবে ইনসুলিন দেওয়া উচিত। আর আমরা এখন এগুলো অহরহ ব্যবহার করছি।

Leave a comment