জরিনার যখন বিয়ে হয় তখন ওর বয়স ১৪ বছর বা ১৫ বছর হবে। বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে সে। বাবা সোলিম শেখ দিন মজুর। অভাব অনটনের সংসারে জরিনার লেখাপড়া বেশি দূর এগুতে পারেনি। এরই মধ্যে জরিনাকে বিয়ে দিয়েছে তার বাবা। বিয়ের প্রথম বছরেই সে গর্ভবতী হয়। গর্ভাবস্থায় প্রয়োজন মতো পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় তার শরীরের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সামান্য কাজেই বুক ধড়ফড় করে এবং ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দিন দিন শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। জরিনা একদিকে বাল্যবিয়ের শিকার, অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবারের অভাবে রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।

আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো জরিনার মতো অনেক নারী অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতায় ভুগছে। গর্ভবতী নারীদের রক্তশূন্যতা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। রক্তশূন্যতা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। রক্তশূন্যতা অন্য রোগের উপসর্গ হতে পারে আবার কখনোবা নিজেই একটি রোগ হতে পারে। রক্তের হিমোগ্লেবিনের মাত্রা কোনো কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গেলে তাকে বলা হয় অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা। হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করা। হিমোগ্লোবিন রক্তের লোহিত কনিকায় অবস্থান করে।

রক্তস্বল্পতার উপসর্গের মাধ্যে রয়েছে শরীরের রং ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়, বুক ধড়ফড় করা, দুর্বলতা ও সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা এবং ব্যায়ামের পর শ্বাসকষ্ট হওয়া, কানে ঝিঁঝিঁ শব্দ শোনা, খাবারে অরুচি ও ক্ষুধামান্দ্য, নখ ভঙ্গুর হওয়া বা নখের আকৃতি চামচের মতো হওয়া, কাজকর্ম বা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হওয়া।

চিকিৎসকদের মতে, আমাদের দেশের মা ও শিশুরা সাধারণত আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতায় বেশি ভোগে। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য যে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, তা সাধারণত হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়। তাই শিশুর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতা বিরাট প্রভাব ফেলে। রক্তশূন্যতা নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা দিলেও এটি সব বয়সী মানুষেরই হতে পারে।

স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের রক্তে হিমেগ্লোবিনের পরিমাণ ১৪ থেকে ১৮ গ্রাম বা ডিএল (ডেসিলিটার) থাকে। নারীদের জন্য তা ১২ থেকে ১৬ গ্রাম বা ডিএল। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী ডিএল স্বাভাবিক মানের নিচে থাকলে, সে শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে বলে মনে করা হয়। এক বছর থেকে বয়:সন্ধিকাল পর্যন্ত সাধারণভাবে কোনো শিশুর হিমেগ্লোবিনের পরিমাণ ১১ গ্রাম বা ডিএলের নিচে থাকলে ঐ শিশু রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত।

নানা কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রধান উপাদান হলো আয়রণ। শরীরে আয়রনের উপস্থিতি কমে গেলে রক্তস্বল্পতা হয়। একে বলে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা। এছাড়া ভিটামিন বি ও ফলিক অ্যাসিডের অভাব, দীর্ঘমেয়াদী রোগ যেমন- কিডনি সমস্যা, যক্ষ্মা, ব্লাড ক্যান্সার, থ্যালাসেমিয়া, থাইরয়েড সমস্যা, রক্তক্ষরণ, রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি কারণে রক্তস্বল্পতা হয়ে থাকে। তবে, আমাদের দেশে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার হারই সবচেয়ে বেশি। নারীদের মধ্যে এ হার পুরুষের তুলনায় বেশি। নারীদের গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এখনো আমাদের দেশে কিছু পরিবারে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য রয়েছে। একটি ছেলে শিশুর চেয়ে একটি কন্যাশিশুর কম খাবার দেওয়ার প্রবণতা আছে। এগুলো কন্যাশিশুর রক্তস্বল্পতার কারণ। এছাড়া রক্তস্বল্পতার শিকার এমন মায়ের সন্তানদেরও রক্তস্বল্পতায় বেশি ভুগতে দেখা যায়। রক্তস্বল্পতা মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

আয়রন ঘাটতি কেন হয়? আয়রন ঘাটতির প্রধান কারণ অপুষ্টি। খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন না থাকলে আয়রনের অভাব দেখা দেয়। মায়েদের গর্ভবস্থায় এবং শিশুদের বেড়ে ওঠার সময় বাড়তি আয়রনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেখা যায়, অনেক মা গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার পায় না। আবার অনেক পরিবারে কুসংস্কারের কারণে গর্ভবতী মায়েদের কম খাবার দেওয়া হয়। যেসব নারী অতিরিক্ত ঋতু¯্রাজনিত সমস্যায় ভোগেন, তাদের আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া পেপটিক আলসার, কৃমি, পাইলসের সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি ব্যাথার ওষুধ সেবন ইত্যাদি কারণে রক্তক্ষরণ হলে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় নারীদের রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হলে গর্ভস্থ শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই কম ওজনের অপুষ্ট শিশু প্রসবের আশংকা থাকে। রক্তশূন্যতার কারণে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই গর্ভপাত, প্রসব পরবর্তী অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, সন্তান প্রসবজনিত সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তশূন্যতার কারণে শিশুর বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকেও ব্যহত করে। গবেষণা দেখা গেছে, আমাদের দেশে গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ নারী কমবোশি রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। প্রসবকালীন মা ও শিশু মৃত্যুর শতকরা ২৫ ভাগই আয়রনের অভাবজনিত কারণে ঘটে থাকে।

একজন মানুষের শরীরে আয়রন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ লবণ। গর্ভবতী মা ও গর্ভস্থ শিশুর শরীরে রক্ত তৈরির জন্য স্বাভাবিক প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত আয়রনের দরকার হয়। এজন্য গর্ভাবস্থায় নারীদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এ সময় প্রতিটি মাকে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের প্রতি নজর দিতে হবে। কলিজা, ডিমের কুসুম, মাছ, মাংস, কচুশাক, ডাঁটাশাক, লাল শাক, পালং শাক, শিম, শিমের বিচি, সামুদ্রকি মাছ, কাঁচকলা, আটা, ডাল ইত্যাদি আয়রন সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে দিতে হবে। এছাড়া মুখে খাওয়ার জন্য ক্যাপসুল বা শিরায় ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় অনেক মাই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে চায় না। এ চিত্র গ্রামাঞ্চলেই বেশি। গর্ভধারণের পর থেকেই গর্ভবতী মায়ের অন্তত দুই মাসে পর পর নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা করা অত্যন্ত জরুরি। এখন প্রায় প্রতিটি গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রায় ৩০ প্রকারের ওষুধ দেওয়া হয়। গর্ভবতী মায়েদের এ সরকারি সেবা গ্রহণ করা উচিত। এক্ষেত্রে পরিবারের অন্যান্য সদস্য বিশেষ করে স্বামীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

একজন নারী সঠিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার পাচ্ছে কি না তা অনেকাংশে নির্ভর করে পরিবারের বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তিবর্গের ওপর। তাদের সহযোগিতা একজন গর্ভবতী মায়ের অত্যন্ত দরকার। অনেকেই অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে বিদেশি এবং বেশি দামের খাদ্যের পিছনে ছোটেন। কিন্তু আমাদের হাতের নাগালেই অনেক দেশীয় শাক-সবজি ও ফলমূল রয়েছে যা, বিদেশি খাবারের চেয়ে দামেও সস্তা এবং সহজলভ্য। একটু সচেতন হলেই এসব খাবার গ্রহণ করলে আমাদের গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া আমাদের সকলের অবশ্য কর্তব্য।

প্রয়োজনীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ না করলে গর্ভবতী মায়েদের রক্তস্বল্পতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে অপুষ্ট শিশু জন্মের আশংকাও অনেক বেশি থাকে। একজন মায়ের সুস্বাস্থ্যে সাথে শিশুর স্বাস্থ্য ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। সে কারণে শিশু মায়ের প্রতি বিশেষ করে গর্ভকালীন অবস্থায় গর্ভবতী মায়েদের বিশেষ পরিচর্যা ও যত্নবান হওয়া উচিত। একজন সুস্থ মা একটি সুস্থ শিশু জন্ম দিতে পারে।
লেখক : কলামিস্ট ও মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক

Leave a comment