মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়ে আক্রান্ত অংশের কোষ নষ্ট হওয়াকে স্ট্রোক বা ব্রেন স্ট্রোক বলে আখ্যায়িত করা হয়। বর্তমান বিশ্বে স্ট্রোক মানুষের মৃত্যুর চতুর্থ কারণ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের অংশবিশেষ নষ্ট হওয়ায় রোগীর দেহে বেশ কিছু শারীরিক অক্ষমতা দেখা দেয় যেগুলোকে স্ট্রোকের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যেমন : প্যারালাইসিস, পা, হাত, মুখ অথবা শরীরের ডান বা বাম অংশ অবস হয়ে যাওয়া, কথা বলতে বা কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া, বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পতিত হওয়া, কথা জড়িয়ে আসা, একটা চোখে অথবা উভয় চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া, অথবা ঝাপসা দেখা, চলাফেরা করতে না পারা, চলাফেরায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমে অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়া, হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেওয়া।

প্রাথমিক অবস্থায় কারও স্ট্রোক দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত, তা না হলে রোগীর মস্তিষ্কের বেশি অংশ নষ্ট হয়ে জটিল আকার ধারণ করতে পারে অথবা রোগীর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা মৃত্যু ঘটতে পারে। মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে ইসকেমিক স্ট্রোক হতে পারে অথবা রক্তনালি ফেটে গিয়েও হিমোরজিক স্ট্রোক হতে পারে।

অল্প সময়ের (পাঁচ মিনিটের কম সময়ে) জন্য অজ্ঞান হওয়া, মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, কথা বলতে সমস্যা, শরীরের কোনো অংশ অবস হয়ে যাওয়া এবং পাঁচ থেকে দশ মিনিটে রোগীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাকে মিনি স্ট্রোক বলা হয়। এ অবস্থাকে অবজ্ঞা না করে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। অধিক পরিমাণে লবণ খাওয়া, চর্বি খাওয়া এবং রক্তে অতিমাত্রায় কলেস্টেরলের উপস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিকস ও উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি করে।

আমাদের দেশে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ৬০-৭০ ভাগ রোগী অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা হিসেবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থাকে। যদিও স্ট্রোকের সঠিক কারণ নির্ণয় করা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে বেশকিছু শারীরিক অবস্থা স্ট্রোকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যেমন- আমাদের শারীরিক কর্মতৎপরতার অভাব, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিকস বিদ্যমান থাকা, বংশগতভাবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া ইতিহাসে বিদ্যমান। এ ছাড়া মাদকও ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ (হার্ট ব্লক), হার্টের ভাল্বে সমস্যা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, ইতিপূর্বে যদি কেউ মিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

প্রতিকার : স্ট্রোক প্রতিকারের জন্য শারীরিক কর্মতৎপরতা সম্পন্ন করা, ধূমপান ত্যাগ করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডায়াবেটিকস কন্ট্রোলে রাখা, শারীরিক ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে ওজন কমানো, খাদ্যে পশুর চর্বি ও অধিক পরিমাণ লবণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।

চিকিৎসা : মিনি স্ট্রোক ছাড়া ইসকেমিক ও হিমোরজিক স্ট্রোকে রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অথবা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অতীব জরুরি। রোগী অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপে বিদ্যমান থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য ইনসুলিন জাতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা শ্রেয়। রোগীকে দীর্ঘমেয়াদি অথবা তা থেকে মুক্ত রাখতে প্রদাহ প্রতিরোধক চিকিৎসা, স্ট্রোকের অনেক রোগী খাদ্য গ্রহণে অসমর্থ হয়ে পড়ে, তাদের ইনজেকশন বা নাকে নল দিয়ে খাদ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা, এমআরআই বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হার্ট ব্লক ও হার্টে ভাল্ব থাকা রোগীদের হার্টের চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি।

তাই এসব বিষয়ে আমাদের অবহেলা করা ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো যায়। অন্যথায় জটিলতা বাড়ে। কথায় আছে প্রতিকার নয়, এসব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ উত্তম।

ডা. এম শমশের আলী, (কার্ডিওলজিস্ট)

সিনিয়র কনসালটেন্ট (প্রা.), ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

Leave a comment